বরুড়ার কচু ২৫টি দেশে

বরুড়া প্রতিনিধি
রাস্তার ধারে অযত্নে গড়ে ওঠা কচুই এখন তার ক্ষমতার প্রমাণ দিচ্ছে। গলায় ধরার ভয়ে যে ওলকচু অনেকেই খেতে ভয় পান, সেটিও এখন দেশের গণ্ডি পেরিয়েছে। বাদ যায়নি মানকচু, কচুর লতিও। রপ্তানিতে সংশ্নিষ্টরা বলছেন, এক কুমিল্লার বরুড়া থেকেই ২৫টি দেশে রপ্তানি করা হচ্ছে কচু।
কৃষি বিভাগ বলছে, বরুড়ায় উৎপাদিত পানি কচু ও লতি দুবাই, সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশসহ ১০ থেকে ১২টি দেশে যাচ্ছে। মোট উৎপাদনের প্রায় ১০ শতাংশ যাচ্ছে বিদেশে। গত তিন-চার বছর ধরে বিভিন্ন এজেন্সির মাধ্যমে এই লতি ও কচু রপ্তানি হচ্ছে।
চিটাগং ফ্রেশ ফ্রুটস অ্যান্ড ভেজিটেবল এক্সপোর্টার অ্যাসোসিয়েশন সূত্র জানিয়েছে, ১৯৯৫ সাল থেকে বরুড়ার পানি কচু ও লতি রপ্তানি করছে তারা। ২০১৫ সালে ৯৩০ টন, ২০১৬ সালে ৯৪৫ টন, ২০১৭ সালে ৯৩৫ টন, ২০১৮ সালে ৯৪৫ টন, ২০১৯ সালে ৯৬৫ টন এবং সর্বশেষ ২০২০ সালে ৯৭৫ টন কচু ও লতি রপ্তানি হয়েছে। কৃষি বিভাগের উল্লিখিত দেশগুলো ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপসহ ২৫টির বেশি দেশে যাচ্ছে এই কচু ও লতি।
একসময় বরুড়ায় কচুর খুব একটা আবাদ হতো না। নিজেরা খাওয়ার জন্য কেউ কেউ বাড়ির পাশে কচুগাছ লাগাতেন। তবে পাঁচ-ছয় বছর আগে ধানের দাম কম পাওয়ায় ও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় কৃষক কচু চাষে ঝুঁকেছেন। প্রথমে হাতেগোনা কয়েকজন ধানের বদলে কচু চাষ শুরু করেন। কম খরচে বেশি লাভ, দীর্ঘদিন ফলনের পাশাপাশি কচুর চাহিদা থাকায় বাণিজ্যিকভাবে শুরু হয় কচু চাষ। এরই মধ্যে কচুর উপজেলা হিসেবে বরুড়ার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে।
কচু আর লতিকে ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে কয়েক হাজার মানুষের কর্মসংস্থান। বরুড়ার কচুর সাফল্য দেখে অন্যান্য জেলা থেকে এসে চারা সংগ্রহ করছেন কৃষকরা। গত মৌসুমে বরুড়া থেকে এক লাখ কচুর চারা গেছে দেশের বিভিন্ন জেলায়।
একবার কচু গাছ রোপণ করলেই বছরের অন্তত ৯ মাস প্রতিটি গাছ থেকে লতি তোলা যায়। সাত দিন পরপরই লতি তুলতে পারেন কৃষক। রবি মৌসুমে কচুর চারা রোপণ করা হয়। অন্য সময়ও রোপণ করেন অনেকে। উপজেলার আগানগর, ভবানীপুর ও খোশবাস দক্ষিণ এই তিনটি ইউনিয়নের সবকয়টি গ্রামেই কচু চাষ হচ্ছে। বাকি ১২টি ইউনিয়নেও বিচ্ছিন্নভাবে কচুর চাষ হচ্ছে।
তবে রপ্তানিকারকরা সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে কচু কিনছেন না। আগে কৃষকরা স্থানীয় কয়েকটি বাজারে সাপ্তাহিক হাটের দিন কচু ও লতি নিয়ে যেতেন। ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে পাইকাররা এসে এগুলো কিনে নিতেন। চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় কৃষকদের খুব একটা বাজারে যেতে হয় না এখন। পাইকাররা বাড়ি গিয়ে কচু ও লতি সংগ্রহ করেন।
উপজেলার আটিওয়ারা গ্রামের কচুর বেপারী সানাউল্লাহ, রিয়াদ হোসেনসহ কয়েকজন জানান, তারা চাষিদের কাছ থেকে কচু সংগ্রহ করে ট্রাকে ঢাকা-চট্টগ্রাম পাঠান। সেখান থেকে বাছাই করে বিদেশে পাঠাচ্ছে এজেন্সিগুলো। বাকিগুলো চলে যাচ্ছে বিভিন্ন আড়তে।
উপজেলার আগানগর গ্রামের মো. সেলিম মিয়া জানান, ১০ হাজার টাকা খরচ করে ১৭ শতাংশ জমিতে লতিকচু চাষ করেছেন। বিক্রি করে ৪০ হাজার টাকার মতো পাওয়া যাবে।
চট্টগ্রাম ফ্রেশ ফুডস এক্সপোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি ইসমাইল চৌধুরী হানিফ জানান, তারা পানি কচু আর লতি রপ্তানি করছেন, যা চট্টগ্রাম ও ঢাকা বিমানবন্দর দিয়ে দুবাই, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপসহ ২৫টির বেশি দেশে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, রপ্তানিতে আমাদের একমাত্র সমস্যা হচ্ছে সড়কে চাঁদাবাজি। এ কারণে ক্রেতা পর্যায়ে দাম অনেক বেড়ে যায়।
বরুড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম বলেন, কন্দাল ফসল উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তিতে বিষমুক্ত উপায়ে কচুসহ সবজি উৎপাদনে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
রপ্তানিকারকদের সঙ্গে যোগাযোগ না করার বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, ২০২২ সালের মধ্যে রপ্তানিকারকদেরও কন্দাল প্রকল্পের আওতায় আনা হবে। তখন তারা সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে পণ্য কিনতে পারবেন। এতে কৃষকরাও লাভবান হবেন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *